অক্টোবর ২৯, ২০২০

সত্যের সন্ধানে সবসময়

শিশুর সুশিক্ষা নিশ্চিতে প্রয়োজন স্বাস্থ্যশিক্ষা-শরীফুল্লাহ মুক্তি

শিশুর সুশিক্ষা নিশ্চিতে প্রয়োজন স্বাস্থ্যশিক্ষা-শরীফুল্লাহ মুক্তি

স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক প্রবাদ আছে। প্রবাদ আছে, ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’। ছেলেবেলায় যোগ-ব্যায়ামের বইয়ে একটি কবিতা পড়েছিলাম। কবিতাটি ছিল এ রকম- ‘না হবে তোমার লেখাপড়া কিছু/না হবে বিষয়-ভোগ/লেখাপড়া ছেড়ে যদি ভগবানে মন দাও/অসুস্থ শরীর অশান্ত মন ব্যর্থ করিবে তাও।’ আমি মনে করি কথাগুলো একেবারেই যথার্থ। আমরা জানি, স্বাস্থ্য যদি ভালো না থাকে তবে উচ্চ শিক্ষিত হয়েও, প্রচুর অর্থসম্পদের মালিক হয়েও জীবনের পরিপূর্ণ স্বাদ পাওয়া যায় না। তাই সকলেরই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত অত্যাবশ্যক। আর এই স্বাস্থ্য সঠিক রাখতে গেলে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের কিছু কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, কিছু কিছু নিয়ম মেনে চলতে অভ্যস্ত করতে হবে। এজন্য পড়ালেখার পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা দেয়া জরুরি।

শুধু দেহ নীরোগ থাকলেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায় না। সুস্বাস্থ্য হলো দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক বৃত্তিসমূহের সুষ্ঠু বিকাশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে- Health is state of complete physical, mental and social well being and not merely the absence of disease.’ অর্থাৎ ‘শুধু রোগ প্রতিরোধ নয়, সমাজের মঙ্গল এবং শারীরিক ও মানসিক পূর্ণাঙ্গ উন্নতিই হলো স্বাস্থ্য’। আর সুস্বাস্থ্য বলতে শুধু শারীরিক সুস্থতাকেই বোঝায় না, সুস্বাস্থ্য হলো- শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা। সুস্বাস্থ্য মানুষকে কর্মোদ্যম ও সৃজনশীল করে। সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ অন্যের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে শরীরের বাইরেও মানুষের শিক্ষাগত অবস্থা, মানুষের সামাজিক অবস্থা, মানুষের পরিবেশগত অবস্থা, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।।

শিক্ষা কী? গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, ‘শিক্ষা হচ্ছে সত্যের আবিস্কার এবং মিথ্যার অপনোদন’। দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, ‘শিক্ষা শিক্ষার্থীর দেহ ও মনে সকল সুন্দর ও অন্তর্নিহিত শক্তিকে বিকশিত করে তোলে। দার্শনিক এরিস্টটলের মতে, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হচ্ছে শিক্ষা’। দার্শনিক রুশোর মতে, ‘শিক্ষা হচ্ছে শিশুর স্বতঃস্ফুর্ত আত্ম-বিকাশ’। ফেডরিক হার্বাটের মতে, ‘শিক্ষা হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের বিকাশ সাধন’। আমেরিকান দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জন ডিউই বলেছেন, ‘শিক্ষা বলতে ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশকে বোঝায়’। মহাত্মা গান্ধীর মতে, ‘শিক্ষা হচ্ছে শিশুর দেহ, মন ও আত্মার শ্রেষ্ঠ গুণাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশ’। বিখ্যাত দার্শনিক ও শিক্ষাবিদদের শিক্ষা সম্পর্কে উপর্যুক্ত মতবাদগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়Ñ শিক্ষার সাথে দেহ ও মন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলতে লেখাপড়া করে জ্ঞান অর্জন করাকে বোঝায়। কোনো ব্যক্তির জীবনের নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সহায়তায় পুস্তকাদি হতে পূর্ব-নির্ধারিত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই এ শিক্ষা সীমাবদ্ধ। কিন্তু আধুনিক কালে শিক্ষাকে ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা বলতে বোঝায়- আচরণের কাক্সিক্ষত, বাঞ্ছিত, কল্যাণমূলক বা সমাজস্বীকৃত অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তন যা বাস্তব জীবনে প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারে। আমরা যদি ভবিষ্যতের জন্য সুনাগরিক গড়ে তুলতে চাই তাহলে জাতিকে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে। আর সুশিক্ষার জন্য চাই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী শিক্ষার্থী। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক সকলের স্বাস্থ্য-সচেতনতা। এটি প্রমাণিত সত্য যে, ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী শিশুরা লেখাপড়ায়ও তুলনামূলকভাবে ভালো। আর খারাপ স্বাস্থ্যের অধিকারী শিশুরা লেখাপড়ায়ও তুলনামূলকভাবে খারাপ বা দুর্বল। কারো শরীর যদি সুস্থ না থাকে, রোগমুক্ত না থাকে, তবে কোনো কিছুতেই তার সুখ হয় না।

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে সুস্বাস্থ্যের কথা অন্তর্নিহিত আছে। আমরা যদি প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যের দিতে তাকাই সেখানেও শিশুর সুস্বাস্থ্যের কথা বলা আছে। প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হলোÑ ‘শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন করা এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা।’ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যে শুধু শিশুদের পড়ালেখার কথাই বলা হয়নি। এখানে শিশুর বিভিন্ন ধরনের বিকাশের কথা বলা হয়েছে এবং প্রথমেই বলা হয়েছে শারীরিক বিকাশের কথা। তাই প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে শারীরিক শিক্ষা বা স্বাস্থ্যশিক্ষা বিষয়টিও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

আমাদের দেশ গরিব দেশ। আমাদের দেশে মূলধারার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে শিশুরা লেখাপড়া করে তাদের বেশিরভাগ অভিভাবকই দরিদ্র ও অসচেতন। তাই স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সচেতন করার দায়িত্ব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর বর্তায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে জানাতে হবে এবং তারা যেন ব্যক্তিগত জীবনে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে সে অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। যে শিক্ষার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকে নীরোগ ও কর্মক্ষম রাখা যায় সে শিক্ষাই হলো স্বাস্থ্যশিক্ষা। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকার বিজ্ঞানসম্মত উপায়সমূহ স্বাস্থ্যশিক্ষার অন্তর্ভূক্ত। শরীর সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম রাখার নিয়ম-কানুন যদি আমরা না জানি তাহলে কখনোই আমরা স্বাস্থ্য সংরক্ষণ করতে পারবো না। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। ব্যক্তিগত ও পারিপার্শ্বিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করার উপায়সমূহ চিকিৎসা-বিজ্ঞানের মাধ্যমে অনুসরণ করার শিক্ষাই হলো স্বাস্থ্যশিক্ষা।

ভালো স্বাস্থ্য গড়ে তুলতে হলে স্বাস্থ্যশিক্ষা অপরিহার্য। শরীর যদি ভালো না থাকে কোনো কাজে তখন মন বসে না। কোনো কাজ করতেও ভালো লাগে না, কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়, মেজাজ রুক্ষ ও খিটখিটে হয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মন প্রফুল্ল থাকে, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ও কাজে উৎসাহ পাওয়া যায়। চেহারায় লাবণ্য ফিরে আসে। এ সব কিছু আমরা স্বাস্থ্যশিক্ষার মাধ্যমে অর্জন করি। আমাদের দেশের অধিকাংশ পিতা-মাতা ও অভিভাবক শিক্ষিত নন। সেজন্য স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাদের সচেতনতা কম। তাই শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য সম্বন্ধে যে জ্ঞান লাভ করবে তা তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে শেয়ারিং-এর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যদি পরিবারের সবাইকে স্বাস্থ্য সম্বন্ধে সচেতন করা যায় তাহলে তাদেরকে দেখে পাড়া-প্রতিবেশীরাও স্বাস্থ্য সম্বন্ধে সজাগ হবে। নিজ পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশীরা যতক্ষণ-না স্বাস্থ্য সম্বন্ধে সচেতন হবে ততক্ষণ সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত ও পারিপার্শ্বিক পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ বাতাস, বিশুদ্ধ পানি, বিশ্রাম ও ঘুম, পরিমিত ব্যায়াম ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী শিশুদের অধিকাংশ অভিভাবকই দরিদ্র ও অসেচতন। দারিদ্র্য দুর্বল স্বাস্থ্যের একটি অন্যতম কারণ। গরিব শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ কম। তাদের স্কুলে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা বেশি, এমনকি স্কুল ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকিও বেশি। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যগত আচরণও লক্ষ করা যায়। একদিকে দীনতা যেমন দুর্বল স্বাস্থ্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে, অপরদিকে দুর্বল স্বাস্থ্য দীনতাকে বাড়িয়ে দেয়। সরকার শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যেমন- দরিদ্র এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কিট প্রদান, নিয়মিত কৃমিনাশক ঔষধ প্রদান, দারিদ্রপীড়িত এলাকায় ডে-মিল কার্যক্রম, উপবৃত্তি প্রদান, ক্ষুধে ডাক্তার ইত্যাদি। এতে দরিদ্র এলাকার শিশুদের মধ্যে বিদ্যালয়ের প্রতি বেশ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, ঝরে পড়ার হার কমেছে এবং শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের মানও ভালো হচ্ছে।

শিশুর স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য আমরা নিয়মিত কিছু বিশেষ দিকের প্রতি লক্ষ রাখতে পারি। যেমন- যথাসময়ে সকল শিশুর বিভিন্ন ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টীকা গ্রহণ নিশ্চিত করা, ইনজুরি হতে পারে এমন কাজ থেকে শিশুদের বিরত রাখা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে শিশু ও অভিভাবকদের ধারণা দেয়া, শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে শেখানো, শিশুদের খাবার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ার অভ্যাস গঠন করা, গোসলে সাবান এবং শ্যাম্পুর ব্যবহার শেখানো, দিনে দু’বার দাঁত ব্রাশ করতে শেখানো, নিরাপদ পানি সম্পর্কে ধারণা প্রদান এবং নিয়মিত ও পরিমিত নিরাপদ পানি পান করার অভ্যাস তৈরি করা, জুতা ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন স্কুলড্রেস পড়ে স্কুলে আসা, টয়লেটে স্যান্ডেল ব্যবহার করার অভ্যাস গঠন করানো, ঘরবাড়ি-বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে ধারণা প্রদান এবং নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা, নিয়মিতভাবে চোখ, কান ও দাঁতের ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া, শিশুদের বয়ঃসন্ধিকালীন বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সময় তাদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান, মাঝে মাঝে শিশুদের মধ্যে হাইজিন প্যাক (সাবান, নেইল কাটার, টুথপেষ্ট, টুথব্রাশ, চিরুণি ইত্যাদি) বিতরণের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন রোগের উপসর্গ ও করণীয় নিয়ে লিফলেট তৈরি ও বিতরণ করা, বিদ্যালয় ও বাসায় হাতের কাছে ফাস্ট এইড বক্স রাখা এবং এর প্রয়োজনীয় ব্যবহার নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

শিশুর সুস্বাস্থ্য রক্ষায় আর একটি বিষয়ের প্রতি আমাদের নজর দেয়া জরুরি। আমাদের দেশে ৭০% মানুষ গ্রামে বাস করে যাদের সন্তানেরা বেশির ভাগই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। গ্রাম-শহর মিলিয়ে প্রায় ৮০% পরিবারের শিশুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। আর এই শিশুদের মাঝে বিশেষত ৩য়-৫ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশেরই মেধার বিকাশ যথাযথভাবে ঘটে না। কারণ অধিকাংশ শিশুই দুপুরের সময়টা না খেয়ে থাকে; অথচ খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে বাঙালিদের মূল খাবার হলো দুপুরের খাবার। ফলে অপুষ্টির শিকারসহ শারীরিক, মানসিক ও মেধা-বিকাশে মারাত্মক বিঘ্নের সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে আমাদের কোমলমতি শিশুরা পড়াশুনায় বেশিদুর এগোতে পারছে না অথবা এক সময় স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। এসব শিশুর শারীরিক, মানসিক ও মেধা-বিকাশসহ প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে মিড-ডে মিল কর্মসূচি ফলপ্রসু ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার, দাতাসংস্থা বা এনজিও-এর দিকে না থাকিয়ে নিজেরাই মিড-ডে মিল চালু করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। বিদ্যালয়গামী সন্তানটি যদি দুপুরে বাড়িতে অবস্থান করতো, তবে সে নিশ্চয়ই দুপুরের খাবার খেত। এই খাবারটিই যদি তাকে টিফিনবক্সে দিয়ে দেয়া হয় তবে স্কুলে বিরতির সময় সে তা খেতে পারে। সামর্থ্য অনুযায়ী অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের জন্য মিড-ডে মিল তৈরি করে দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শুরুতে বিভিন্ন সংস্থা বা উপজেলা প্রশাসন বা স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিবর্গ একই ধরনের টিফিনবক্স সরবরাহ করতে পারেন। এটি শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে মিড-ডে মিল চালুকরণে অনুপ্রেরণা যোগাবে।

ছোটবেলা থেকেই শিশুকে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস করাতে হবে। যে খাবারগুলো শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটায়, শিশুর শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য এবং মস্তিস্কের বিকাশ ঘটায় সেগুলো সম্পর্কে শিশুকে ধারণা দিতে হবে এবং নিয়মিত খাওয়ার জন্য অভ্যস্ত করাতে হবে। শিশুকে স্বাস্থ্যকর খাবার ও অস্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারনা দিতে হবে। শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের জন্য এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে থাকার জন্য পরামর্শ দিতে হবে। রাস্তার/ফুটপাতের খাবার, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, ফাস্ট ফুড, আইসক্রিম, ধুলোবালিযুক্ত খাবার ইত্যাদি না খাওয়ার জন্য শিশুকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

আমাদের দেশে বিদ্যালয়গামী শিশুর মধ্যে বয়সজনিত কারণে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কিন্তু বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বাবা-মা বিষয়টিকে তেমন কোনো গুরুত্ব দেন না। আবার অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানের এ ধরনের পরিবর্তনের কারণে বেশ দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আসলে এ পরিবর্তনগুলো খুবই সাধারণ ব্যাপার; এগুলো বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন। বয়ঃসন্ধি হলো শৈশব ও যৌবনের মধ্যবর্তী বিভিন্ন শরীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটার একটি সময়। এ সময় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর শরীর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে রূপান্তরিত হয় ও শিশু প্রজনন-সক্ষমতা লাভ করে। বয়ঃসন্ধিকাল হলো কয়েকটি বছরের সমষ্টি; যখন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দ্রুত ঘটতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে যৌন-প্রজনন জীবনকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। আমাদের দেশে বয়ঃসন্ধিকাল শুরুর গড় বয়স মেয়েদের জন্য ১০-১১ বছর এবং ছেলেদের জন্য ১২-১৩ বছর। প্রত্যেকেরই বয়ঃসন্ধিকালের বেড়ে ওঠা তার বংশধারার বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চা দ্বারা প্রভাবিত হয়। কাজেই এ সময় বাবা-মা’র যেমন দুঃশ্চিন্তা করার তেমন কোনো কারণ নেই, তেমনি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ারও তেমন কোনো কারণ নেই। বয়ঃসন্ধিকালে প্রধানত দুই রকমের পরিবর্তন হয়, একটি শারীরিক ও অপরটি মানসিক। এ পরিবর্তনগুলো পরস্পর নির্ভরশীল। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে বাইরের পরিবর্তনগুলো ঘটে ভিতরের পরিবর্তনের ফলে, আর কিছু ক্ষেত্রে ভিতরের পরিবর্তনগুলো ঘটে বাইরের পরিবর্তনের ফলে।

বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন সম্পর্কে সবারই যাবতীয় তথ্য জানার অধিকার রয়েছে। পরিবার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও সমাজ কিশোর-কিশোরীদের এই তথ্যগুলো দিতে পারে। কোনো কোনো অভিভাবক মনে করেন, বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে আলোচনা করা ঠিক নয়। এটিকে তারা সামাজিক অনুশাসনের বিপরীত কাজ বলে মনে করেন। কিন্তু তাদের এই সীমাবদ্ধতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কিশোর-কিশোরীরা বয়ঃসন্ধিকালের বিভিন্ন পরিবর্তনের বিষয়ে সঠিক তথ্য পেলে তারা বিভিন্ন ভুল ধারণা দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ক্ষতির শিকার হবে না বা হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। নিজেরা বুঝে চলতে পারবে। যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। তাই বাবা-মা ও অভিভাবকদের বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে এবং বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে তাদের সন্তানদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। এ সময় তাদেরকে দূরে ঠেলে দেয়া যাবে না; চোখে চোখে রাখতে হবে। তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। এই পরিবর্তনগুলো খুবই স্বাভাবিক, যা সাধারণত প্রতিটি মানুষের জীবনেই ঘটে। কাজেই এগুলো নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, দুঃশ্চিন্তারও কিছু নেই।

শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের বিভিন্ন ধরনের খেলা খেলতে দিতে হবে। খেলাধুলার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে হবে। ধারণা দিতে হবে সুস্থ ও সবল দেহের জন্য ব্যায়াম অপরিহার্যতা সম্পর্কে। শিশুদের নিয়মিত মুক্ত হস্তের কিছু শারীরিক ব্যায়াম ও কিছু মাথার ব্যায়াম করানো প্রয়োজন। তার জন্য আলাদা করে সময় বের করে নিতে হবে। ব্যায়াম দেহ ও মনকে বলিষ্ঠ, সুগঠিত ও কর্মঠ করে। দুই ধরনের ব্যায়ামই শিশুদের পেশী সঞ্চালনের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। মাথার ব্যায়ামগুলো শিশুদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে ব্যায়াম নিয়মমাফিক ও পরিমিত করা উচিত। মাঝে মাঝে শিশুদের সাথে ব্যায়ামের উপকারিতা নিয়েও আলোচনা করতে হবে। বিদ্যালয়ে দৈনিক সমাবেশে দশ মিনিট শরীরচর্চা (পিটি) অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (প্রাথমিক/নিম্ন-মাধ্যমিক/উচ্চ-মাধ্যমিক) দৈনিক সমাবেশ কর্মসূচি অবশ্যই পালন করার নির্দেশ রয়েছে। সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এবং বর্ষা মৌসুমে বারান্দায় বা শ্রেণিকক্ষে যথাযথ নিয়মে দৈনিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষার্থীরা দৈনিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন রকমের সামাজিক গুণাবলী অর্জন করে। এই সমাবেশ শিশুদের দেশাত্মবোধ, ধর্মীয়-অনুভূতি, নেতৃত্বদান, শৃঙ্খলাবোধ, সুন্দর চরিত্র ও সুস্বাস্থ্য গঠনে ভূমিকা রাখে। তবে অল্প কিছু বিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে দৈনিক সমাবেশ পরিচালিত হলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে দৈনিক সমাবেশ পরিচালনা আমরা এখনও নিশ্চিত করতে পারিনি। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে অবশ্যই শারীরিক শিক্ষা বা স্বাস্থ্যশিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের মাধ্যমে নিজ নিজ বিদ্যালয়ে দৈনিক সমাবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

ভবিষ্যতের জন্য সুনাগরিক পেতে হলে আগামী প্রজন্মকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। সুশিক্ষিত জাতির জন্য সুশিক্ষা খুবই জরুরি। আর এই সুশিক্ষা নিশ্চিতের জন্য চাই শিক্ষার্থীর সুস্বাস্থ্য। এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, স্বাস্থ্য ভালো থাকলে শিশু লেখাপড়াও ভালো হয়। এই জন্য শিক্ষক, অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সকলেরই শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে সমবেতভাবে কাজ করতে হবে। এটা এখন সময়ের দাবি। আর সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিশুকে অবশ্যই স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে পুরোপরি ধারণা থাকতে হবে এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। নতুবা সুশিক্ষা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে সোনার হরিণ হয়েই থেকে যাবে।

লেখক:
শরীফুল্লাহ মুক্তি
প্রাবন্ধিক, শিক্ষা-গবেষক ও ইন্সট্রাক্টর,
উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি),
বারহাট্টা, নেত্রকোনা।

error: Content is protected !!